শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে

রাত্রির আকাশ

রাজিয়া পিংকি।।

গভীর রাত, রাত্রির চোখে ঘুম নেই। চোখ দিয়ে জল বেয়ে টল টল করে গড়িয়ে পড়ছে। দুই পাশে দুই ছোট ছোট সন্তান। ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর ভাবছে কি করে বাকি পথ ওদের নিয়ে একা চলবে সিঙ্গেল মাদার হয়ে। ভেবে খুব কস্ট হচ্ছে। বাচ্চাদের জন্য সংসারের জন্য ভালো জব ছেড়ে সংসারে সময় দিয়েছে। বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য কখনো গৃহকর্মীর নিকট বাচ্চা রেখে পয়সার পেছনে ছোটেনি। এক যুগেরও বেশি হয়ে গেলো রাত্রি আর তপুর সংসার। ঘর আলো করে এসেছে তাদের দুটো সন্তান। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। এই তেরোটি বছর রাত্রি মেয়েটি অনেক কিছুর সাথেই আপোষ করেছে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য, সংসারের সুখের জন্য। তারপরেও শেষ রক্ষা হলনা। রাত্রির স্বামী নিঁখোজ হওয়ার পূর্বে শেষ দুই বছর রাত্রিকে প্রচন্ড শারীরিকভাবে নির্যাতন করত। একদিন মাথায় আঘাত করতে গিয়ে প্রচন্ডভাবে ঘাড়ে আঘাত দেয়। কানেও প্রচন্ড আঘাত পায়।
নারীবাদী সংগঠনের সাথেও জড়িত রাত্রি। পরিচিত বন্ধু মহলও অনেক বড়। আত্মিয় স্বজন প্রতিপত্তিও কম নয়। এলাকায় ওদের পরিবারের বেশ সুনাম রয়েছে শিক্ষা ও সমাজ সেবায় অবদানের জন্য। কিন্তু কাউকে শেয়ার করতে পারছেনা ওর এই নির্মম পরিস্থিতির কথা। একে তো পছন্দের বিয়ে তার উপর নিজের ও পরিবারের মান সম্মানের কথা ভেবে কারও সাহায্য নিতে পারছোনা, কাউকে জানাতেও পারছেনা। রাত্রির বাবা বেঁচে নেই, মা আছেন কিন্তু অসুস্থ। রাত্রির এই অবস্থার কথা শুনতে পেলে তিনি স্ট্রোক করতে পারেন। প্রচন্ড ভালোবাসেন রাত্রিকে।
ঘরে ঢুকেই রাত্রির দোষ খুজে বেড়ানো একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছো তপুর। একদিন ঘাড়ে ও গলায় প্রচন্ড আঘাতের পর মনে হল রাত্রি বাঁচবেনা। শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের জীবনের কথা ভেবে রাত্রি সেইদিন সহ্য করতে না পেরে আইনের আশ্রয় নিল। রাত্রির কেন জানি মনে হল ওকে প্রাণে মেরে ফেলবে। থানায় জিডি করল। জিডির সূত্র ধরে পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো নির্মম নির্যাতনের কথা। রাত্রি কথা বলতে পারছেনা। পুলিশ তপুকে ফোন দিয়ে বলল আপনার স্ত্রীকে চিকিৎসা করান ভালোভাবে, বেশ হুমকিও দিল। রাত্রির চিকিৎসা করানো হল, বেশ অনেকদিন লাগলো সুস্থ হতে, তা প্রায় মাস দুয়েক। এই দুমাসের বেশ কিছুদিন তপু রান্না বান্না করেছে। তখন সেও উপলব্ধি করেছে সংসারে কত কাজ।
তারপরেও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি তার স্বভাবের।
রাত্রির স্বামী বেশ কয়েক মাস নিঁখোজ। ওদের কোন খোঁজ নিচ্ছেনা, খরচও দিচ্ছেনা। রাত্রি কোনরকম টেনেটুনে টিউশনি করে আর অনলাইনে কাজ করে সময় কাটিয়ে দিচ্ছে। এখন একটা চাকরির খুব প্রয়োজন। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে কার কাছে রাখবে?
ছোট ছোট দুটো বাচ্চা। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। বাচ্চারা বাবা মা ছাড়া কারও নিকট নিরাপদ মনে করেনা রাত্রি। ওদের দিকে তাকালে যে কারও মায়া হবে।
আজ কয়েক মাস ধরে ওদের বাবা সন্তানদের খোঁজ ও রাখেনা। বৃষ্টি ফোন দেয় ফোনও ধরছনা। কল ব্লক করে রেখেছে। রাত্রি বিয়ের পর থেকেই সবসময় সেক্রিফাইস করে এসেছে তার সংসারে। দুজন চাকরি করে সংসারটা গুছিয়েছে। কিন্তু কোথায় কি যেন একটা অভাব। না সেটা অর্থের নয় অন্যকিছু, ভালোবাসা, মায়া মমতা, বোধ। খুব প্রাকটিক্যাল ওদের জীবন। একদিন বৃষ্টি বলল বিয়ের তেরো বছর হয়ে গেলো। কোথাও বেড়ানো হলোনা। চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি, বৃষ্টির স্বামীর উত্তর “সময় কোথায়”। খুবই কাঠখোট্টা একটা মানুষ।
বাচ্চাগুলোও হাঁপিয়ে উঠেছে, একে তো স্কুল বন্ধ করোনা পরিস্থিতি তার উপর ঘরে বন্দী জীবন। এক যান্ত্রিক আবদ্ধ পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে বাচ্চারা। জীবনের বৈচিত্র্য বাহিরের জগৎ সম্পর্কে ওদেরও ধারণা হচ্ছেনা। আজ ২ টি বছর যাবৎ বৃষ্টি পুরো সংসার চালাচ্ছে টিউশনি করে ও ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ করে। ভালো পরিবারের মেয়ে। কখনো সংসারে কস্ট করতে হয়নি। আজ পুরো সংসারের দায়িত্ব ওর কাধে। হাট,বাজার থেকে শুরু করে, ঘরের সব কাজ, পুরো সংসার ওকেই সামলাতে হয়।
সবচেয়ে অসহায় অনুভব করে যখন সন্তানরা অসুস্থ হয় চিকিৎসার জন্য ওকে একাই দৌড়াতে হয় ডাক্তারের কাছে। অনেকটাই নিঃসঙ্গ অনুভব করে তখন, মাঝেমাঝে হেল্পলেস হয়ে যায়। বাচ্চারা যখন অসুস্থ হয় তখন মায়েরাও বুঝি মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে যায়, অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাশে কেউ থাকলে ভরসা পায়।
রাত্রির স্বামী বেশ অনেকদিন ধরেই নেশা করা শুরু করে। নেশা করে রাতে এসে ওর উপর অমানবিক নির্যাতন করত। যখন কিছুদিনের জন্য একটা কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে ঢাকার বাহিরে বেরিয়ে যায় তখন খুব একটা কস্ট হয়নি রাত্রির। কারণ সে বাড়িতে থাকলেও একটা অশান্তির মধ্যে রাখে সবসময়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা ভেবে রাত্রি একা একা ভালোই থাকে দুই সন্তানকে জড়িয়ে। সারাদিন সংসারের কাজ, টিউশনি আর বাচ্চাদের সাথে সুন্দর সময় কেটে যায় ওর। রাত্রি চিন্তা করে, সন্তানদের মাঝেই প্রকৃত সুখ। এই বাচ্চাগুলো না থাকলে ও হয়ত এত সুন্দরভাবে বাঁচতে পারতোনা। তাই সৃষ্টিকর্তার নিকট সবসময় শুকরিয়া আদায় করে সে এই অমূল্য ধনের জন্য। বাচ্চারাও ওদের বাবার কথা মনে করেনা, কারণ ওরাও দেখেছে বাবার বীভৎস কদাকার চেহারা। তাই মামনিকে জিজ্ঞেশও করেনা অরণ্য বা ঐশী যে বাবা কবে আসবে বা বাবা কোথায়। ছেলের নাম অরণ্য, মেয়ের নাম ঐশী৷
এভাবে রাত্রির জীবন থেকে আরও ছয়টি মাস কেটে যায়। তপুর কোন খোঁজ নেই। ওদের বাড়ি বগুড়াতেও খোঁজ নিয়ে জানা গেলো সেখানেও সে নেই। কোথায় আছে কি করছে কেউ বলতে পারেনা। তবে বেঁচে আছে।
হঠাৎ একদিন রাত্রির মেয়ে ঐশীর প্রচন্ড জ্বর। অনেকবার বমি করেছে। নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। কাকে জানাবে প্রথমেই তপুকে ফোন দিল। নাম্বার বন্ধ। চোখেমুখে অন্ধকার। রাত্রির মায়ের পরিবারের অন্য সবাই কিছুটা দূরত্বে থাকলেও বিপদে আপদে সবাই ঝাপিয়ে পড়ে। সবাই ব্যস্ত থাকে, এই করোনা পরিস্থিতিতে কেউ বাসা থেকে বের হয়না। রাত্রি কাউকে আর বিরক্ত করতে চায়না। একটা সময় সবাইকে খুব জালিয়েছে। এখন নিজের সমস্যা দুঃখ যাতনা সব একাই সামলাতে চায়। ডাক্তার আত্মিয় ও বন্ধুকে ফোন দিল। অনেক রাত সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ আর ফোন রিসিভ করেনি। হসপিটালে নিতে হবে মেয়েকে, অচেতন অবস্থা। স্যালাইন দেয়া লাগতে পারে। প্রচন্ড বমি করেছে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে আছে। আত্মিয় স্বজন যাদেরকেই ফোন দেয় সবাই গভীর ঘুমে। গভীর রাত, কেউ জেগে নেই। রাত্রি সারা রাত জেগে কান্নাকাটি করল। মেয়ের মাথায় জল দিল, জল পট্টি দিল, সারা শরীর মুছে দিল। জর থামছেই না। মেয়ে অচেতন। স্যালাইন বানিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করল। খেতে পারছেনা। পুরো অচেতন। সারারাত রাত্রি না ঘুমিয়ে মেয়ের সেবা করল, চোখের জলে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করল। শেষ রাতে বারান্দায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি ভাবছে উপরে যে আছো তুমি কি দেখতে পাচ্ছো? তুমি ছাড়া আমাদের আর বাঁচানোর কেউ নেই। খুব ভোরবেলা বাড়িওয়ালাকে ফোন দিল বৃষ্টি। বাড়িওয়ালা খুব ভালো ছিল, তাঁর ডাক্তার ছেলেকে পাঠিয়ে দিল, নাম রাফিন। রাফিন ছেলেটি খুব ভালো, রাত্রিকে খুব সম্মান করে। রাফিন এসে জানালো এখনই হসপিটালে নিতে হবে স্যালাইন দিতে হবে, ডিহাইড্রেশন হয়ে গিয়েছে। রাফিন নিজেই গাড়ি বের করল, ঐশীকে কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠালো। রাত্রিও ব্যাগ ও টাকা পয়সা গুছিয়ে রওনা হল। যাওয়ার পথে সেজো বোনের বাসায় ছেলে অরণ্যকে রেখে গেলো। অরণ্য তখনো গভীর ঘুমে। জেগে থাকলে হয়ত রেখে যেতে পারতোনা।কারণ দুই ভাই বোন পিঠাপিঠি। কেউ কাউকে ছাড়া একা থাকতে পারেনা। আর হসপিটালে সুস্থ বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার তো কোন মানেই হয়না। ডা. রাফিন নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে হাসপাতালে নিয়ে গেলো এবং ইমার্জেন্সিতে কথা বলে ভর্তির সকল ব্যবস্থা করল। ততক্ষণে রাত্রি ভাই বোন সবাইকে জানালো। ভাই বোনরা অর্থ দিয়ে পাশে দাড়ালো যে যার মত। সাতদিন একাই হসপিটালে মেয়েকে নিয়ে চরম যুদ্ধ করল রাত্রি। এর মাঝে মেয়ের এ্যানিমিয়া হয়েছিল রক্তশূন্যতা থেকে। বেশ কয়েক ব্যাগ রক্তও ম্যানেজ করতে হল। ঐশী সুস্থ হল।
আলহামদুলিল্লাহ রাত্রি বাসায় ফিরে এলো ঐশীকে নিয়ে। একা একা দুই বাচ্চাকে নিয়ে তার জীবন যুদ্ধ। সংসারে অনেক খরচ, তপুর আশা বাদ দিতে হবে। এবার একটা চাকরি করতেই হবে, কিন্তু বাচ্চাদের কে দেখবে সেটাই ভাবছে রাত্রি রাত জেগে। দুই বাচ্চা দুই পাশে ঘুমে। দুই হাতে ওদের মাথায় হাত বুলাচ্ছে। খুব নিষ্পাপ দুটো বাচ্চা। ওদের একটা সুস্থ ও নিরাপদ জীবন দিতে পারবেতো রাত্রি? ঘুম আসছেনা চোখে অনেক দুশ্চিন্তা ভর করেছে।
২৫.০৬.২১

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD